ফরিদপুর মুক্ত দিবসের একটি যুদ্ধের ঘটনা …বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ শামসুদ্দীন মোল্লা

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাস। দেশের বিভিন্ন স্থানে হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের পরাজিত করে বিজয়ের নিশান উড়াচ্ছে মুক্তিযোদ্ধারা। ফরিদপুর তখনো নির্যাতন, হামলা, লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছে পাক বাহীনি ও তাদের দোসররা। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাক বাহীনি আত্মসমার্পন করার পর যখন লাল সবুজ পতাকা পত পত করে উড়ে বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিল আজ আমরা স্বাধীন, তখন ও ফরিদপুর মুক্ত হয়নি।

১৭ ডিসেম্বর পাক – বাহিনী, বিহারী ও তাদের দোসরদের সাথে এক মরনপন যুদ্ধ করে ফরিদপুরের মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় ছিনিয়ে আনে। ফরিদপুর মুক্ত হয় ১৭ ডিসেম্বর। আমি মোকাররম -ফয়েজ বাহিনীর এক জন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তি বাহিনী ও মুজিব বাহিনীর (কমান্ডার নীতি ভূষন সাহা) যৌথ কমান্ডের নেতৃত্বে বর্তমান রাজবাড়ী জেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের লক্ষনদিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৭৫ জন মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান করছিল, ঐ ক্যাম্প থেকে যৌথ কমান্ডের নির্দেশ ক্রমে মুক্তি ও মুজিব বাহিনীর গেরিলারা বিভিন্ন স্থানে অপারেশন চালাতো।

আমাদের কমান্ডার মোকাররম-ফয়েজ কমান্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফরিদপুর শহর আক্রমন করার জন্য ফয়েজ ভাই এর নেতৃত্বে ৩০/৪০ জনের একটি দল অম্বিকাপুর ইউনিয়নের ভাষান চর এলাকায় অবস্থান নেয়। হাবিলদার আবু তাহের দেওয়ান এর নেতৃত্বে আমি, সুবল, সিদ্দীক টুকুসহ ১৪ জনের একটা দল অবস্থান নেই চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের আব্দুল মোল্লার বাড়ীতে।

১৭ ডিসেম্বর সকাল আট টায় আমরা নাস্তা করছিলাম, এমন সময় ক্যাম্পে খবর এলো গোয়ালন্দ থেকে চার-পাঁচ শত লোকের সশস্ত্র দল (রাজবাড়ী ও গোয়ালন্দ থেকে পালায়নরত পাক-বাহিনী, রাজাকার ও বিহারীর দল) পদ্মার পাড় দিয়ে ফরিদপুরের দিকে আসছে। আমাদের কমান্ডার আবু তাহের দেওয়ান দ্রুত পদ্মা পাড়ে পজিশন নেওয়ার নির্দেশ দেন। আমরা পদ্মা থেকে উঠে আসা নালার মধ্যে এ্যামবুশ নেই।
711
পদ্মার পাড় দিয়ে আমাদের বিপরীত দিক থেকে রাজবাড়ী-গোয়ালন্দ থেকে আসা পাক-মিলিশিয়া বিহারী সাথে সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হয়। সামনা- সামনি এই যুদ্ধে আমাদের কাছে ছিল এল এম জি, এস এল আর, এস এম জি, রাইফেল ও গ্রেনেড। প্রায় তিন ঘন্টা অবিরাম গোলা গোলি চলছে।

ইতি মধ্যে খবর পেয়ে আমাদের ক্যাম্প থেকে নীতি ভূষন সাহা, খান মাহাবুব এ খোদা, হায়দার ভাই, হাফিজ ভাই, সৈয়দ শহিদ, জুলমত, আলাউদ্দীন, গফুরসহ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা এসে আমাদের সাথে যোগ দেয়, ভাসান চর থেকে আমাদের কমান্ডের টু আই সি আবুল ফয়েজ শাহনেওয়াজ পঞ্চাশ জন মুক্তিযোদ্ধার দল নিয়ে আমাদের সাথে যোগ দেয়। মিরোজ ভাই, শহীদ সালাউদ্দীন বাহিনীর ডা:ইমরান মজুমদার রুনু, আমিনুর রহমান ফরিদ ভাই, খলিলসহ

ফরিদপুরে অবস্থিত শত শত মুক্তিযোদ্ধা এই যুদ্ধে অংশ গ্রহন করে। অন্য দিকে খবর পেয়ে মানিকগঞ্জ থেকে ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম এর নেতৃত্বে লঞ্চে করে বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা এই যুদ্ধে অংশ নেয়। এই যুদ্ধে আমার পাশ থেকে আমাদের দলের এক মাত্র মুক্তিযোদ্ধা ইউনুছ মোল্লা শাহাদাৎ বরন করে। সবাই যখন বিজয় উল্লাসে ব্যাস্ত ফরিদপুরের বুকে উড়ছে লাল সবুজের পতাকা আমরা তখন শহীদ সহযোদ্ধা ইউনুছের লাশ দাফন করে ব্যাথাতুর হৃদয়ে শহরে ফিরছি।

15/12/16, 6.40 pm