রোজায় পণ্যের দাম বিদেশে কমে দেশে বাড়ে !

বিভিন্ন মুসলিম দেশ বিশেষ করে আরব দেশগুলোতে রমজান মাসজুড়ে ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় নামেন কে কত কম দামে জিনিসপত্র বিক্রি করতে পারেন। গোশত থেকে শুরু করে চাল, ময়দা, চিনি, তেল, দুধসহ যাবতীয় নিত্যপণ্যের দাম নেমে আসে অর্ধেকে। অনেক দেশে ভোজ্য তেলের দাম কমে নেমে আসে তিন ভাগের এক ভাগে। কোনো কোনো পণ্য ৯০ ভাগ পর্যন্ত ছাড়ে বিক্রি করা হয়। ব্যবসায়ীদের নিজ উদ্যোগে দাম কমানো ছাড়াও অনেক দেশে সরকারিভাবে রমজান মাসে পণ্যের দাম কমিয়ে নির্ধারণ করে দেয়া হয়।

অপর দিকে ঠিক যেন উল্টো চিত্র বিরাজ করে বাংলাদেশে। কত বেশি লাভ করা যায়, কত বেশি হাতিয়ে নেয়া যায় সেজন্য রমজান মাসের আগমনের জন্য মুখিয়ে থাকেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। অনেকে অপেক্ষায় থাকেন রমজানে আঙুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হওয়ার জন্য। রমজান মাস সত্যিই বরকতের মাস বাংলাদেশের অতি লোভী, প্রতারক ব্যবসায়ী শ্রেণীর কাছে।

রমজানে চাহিদা বাড়ে বিশেষ কিছু পণ্যের। আর এ সুযোগে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী বাড়িয়ে দেয় সব পণ্যের দাম, বাজারে কোনো ঘাটতি না থাকলেও। বহুকাল ধরে রমজান যেন বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মাস। আর এদেশে অনেক পণ্যের দাম একবার বাড়লে তা আর কখনো কমে না। এভাবে প্রতি রমজানে বাংলাদেশে কিছু পণ্যের দাম নিয়মিত বাড়ছে এবং সারা বছরের জন্য সেই বর্ধিত মূল্যই চালু হয়ে যায়। বিশেষ করে গরুর গোশতের ক্ষেত্রে গত কয়েক বছর ধরে এ ধারাই পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। শুধু কি জিনিসের দাম বৃদ্ধি করেই এরা ক্ষান্ত থাকে? কত ধরনের প্রতারণা আর ভেজাল দিয়ে জিনিসপত্র চালিয়ে দেয়া যায় চলে তার প্রতিযোগিতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে।

অথচ বিভিন্ন মুসলিম দেশে রমজান মাসে চলে বাংলাদেশের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। বিশেষ করে আরব দেশগুলোতে রমজান মাসজুড়ে চলে দাম কমানোর প্রতিযোগিতা। সরকারিভাবে যেমন বিভিন্ন জিনিসের দাম কমিয়ে নির্ধারণ করে দেয়া হয় তেমনি বেসরকারি পর্যায়েও ব্যবসায়ীরা দাম কমানো এবং বিশেষ ছাড়ের প্রতিযোগিতায় নামেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে শতকরা ৯০ ভাগ পর্যন্ত পণ্যের ছাড় ঘোষণা করা হয় রমজান উপলক্ষে। সাধারণ আয়ের মানুষ সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন রমজান মাসে কম দামে জিনিসপত্র কিনে সংগ্রহের জন্য। বিশেষ করে গরিব প্রবাসীদের জন্য রমজান মাস সেখানে আনন্দের বন্যা বয়ে আনে কেনাকাটার জন্য। অনেকে নামমাত্র মূল্যে পণ্য কিনে জাহাজ ভরে দেশে পাঠানোরও ব্যবস্থা করেন।

রমজানে মূল্য ছাড়ে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে আরব আমিরাত। খালিজ টাইমস পরিবেশিত এক খবরে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে রমজান উপলক্ষে ৯০ ভাগ পর্যন্ত ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রায় এক হাজার পণ্যের ওপর এ ছাড়া দেয়া হয়েছে। এ জন্য যাবতীয় ঘাটতি মন্ত্রণালয় বহন করবে।

সৌদি আরবেও শুরু হয় রমজান উপলক্ষে ছাড়ের হিড়িক। ৭০ থেকে ৮০ ভাগ পর্যন্ত ছাড়ের ঘোষণা দেয়া হয় বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। সৌদি আরবের বড় বড় চেইন শপ, সুপার মার্কেট থেকে শুরু করে ছোট ছোট দোকানেও ছাড়ের হিড়িক শুরু হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ ছাড়ের বিজ্ঞাপন প্রচারের পাশপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান লিফলেট প্রকাশ করে তা মানুষের বাড়ি বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছে।

সৌদি আরবে নির্দিষ্ট পণ্যে সরকার ঘোষিত ছাড়ের বাইরেও ব্যবসায়ীরা অনেক সময় আরো ছাড় দিয়ে থাকেন। সৌদি আরবে পাঁচ কেজি ওজনের বাসমতি চালের ব্যাগ রমজানের আগে বিক্রি হতো ৩৮ রিয়াল আর রমজানে তা বিক্রি হয়েছে ১৯.৯৫ রিয়াল দরে। দশ কেজি চিনির ব্যাগ রমজানের আগে ছিল ৩১.৯৫ রিয়াল আর রমজানে বিক্রি হয় ১৪.৯৫ রিয়ালে। দশ কেজি ময়দা স্বাভাবিক সময়ে বিক্রি হয়েছে ৩৫ রিয়ালে আর রমজানে বিক্রি হয়েছে ১৮.৯৫ রিয়াল। পৌনে দুই লিটার ভোজ্য তেলের ক্যান ১২.৫০ রিয়াল থেকে নেমে যায় ৪.৯৫ রিয়াল। এভাবে মাছ-গোশতের দামও রমজানে অর্ধেকেরও কম দামে বিক্রি হয় সেখানে।

কাতারে রমজান মাস শুরুর বেশ আগে থেকেই বিশেষ ছাড়ে জিনিসপত্র বিক্রি শুরু হয়ে যায়। গালফ টাইমস পরিবেশিত এক খবরে জানা যায় একটি তালিকা প্রকাশ করেছে কাতারের অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তালিকায় যেসব পণ্যের দাম কমানো হয়েছে সেগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পবিত্র রমজান মাস উপলেক্ষ এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে খাদ্যসামগ্রী কেনার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ সহায়ক হবে। ময়দা, চিনি, চাল, পাস্তা, তেল, দুধসহ রমজানে সাধারণভাবে ব্যবহৃত সব পণ্যের দাম কমানো হয়েছে। খাদ্যদ্রব্য ছাড়াও অন্যান্য জিনিসের দামও কমানো হয়েছে। দোকানগুলোতে এ তালিকা প্রকাশ ছাড়াও মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।

শুধুু মুসলিম দেশ নয়, আমাদের কাছের দেশ থাইল্যান্ডেও রমজান মাস উপলক্ষে মুসলমানসহ সবার জন্য পণ্যে বিশেষ ছাড় ঘোষণা করে। এছাড়া ফ্রান্সসহ অনেক দেশে মুসলমান ব্যবসায়ীরা রমজানে বিভিন্ন জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে থাকে প্রতি বছর।

পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে মূল্য হ্রাস হওয়ার কথা। কিন্তু দুঃখের সাথে লক্ষ্য করা যায় দেশে নৈতিক শিক্ষার এমন প্রয়োগ হয় যে, অর্থনৈতিক চলকগুলো তাদের স্বভাবসুলভ আচরণের বিপরীতে রমজান মাসে আমাদের দ্রব‍্যমূল্য বৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। এমনকি এমাস বছরের মূল্য বৃদ্ধির জন্য একটি মৌসুম হয়ে উঠেছে, যা আমাদের কাম‍্য নয়। এই দূরবস্থা হতে উত্তোরণের জন্য সবাইকে এগিয়ে আসা দরকার। রমজানে চাহিদাসম্পন্ন নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর সরকারি ভর্তুকি ও আমদানি বৃদ্ধিকরণ, টিসিবির কার্যক্রম সম্প্রসারণ, কর্তৃপক্ষের বাজার মনিটরিং জোরদার, সাধু ব‍্যবসায়ীদের জন্য পুরস্কার, অসাধু ব‍্যবসায়ী মজুতদার কালোবাজারী ও ভেজাল প্রতিরোধ, মধ‍্যসত্তাভোগী হ্রাস করা, বিকল্প বাজার সরবরাহ ব‍্যবস্থা গড়ে তোলা, ক্রেতাকে যাচাই করে পরিমিত পণ্য কেনা, সংশ্লিষ্ট সকলের সজাগ দৃষ্টি এবং সামাজিকভাবে গণ সচেতনতা সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। নোট: দৈনিক নয়াদিগন্ত ১৭ জুলাই ২০১৮ এর তথ্য ও উপাত্ত লেখাটিতে ব‍্যবহার করা হয়েছে।

লেখক- ড. মুহম্মদ কামরুজ্জামান
ডীন, ব‍্যবসায় প্রশাসন অনুষদ
টাইমস ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ফরিদপুর।
এবং
শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা
ক‍নজুমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ
ফরিদপুর জেলা শাখা।