লকডাউন যত বাড়ছে মধ্যবিত্তের বোবা কান্না তত বাড়ছে

প্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ বলেছেন- ‘মধ্যবিত্ত হয়ে জন্মানোর চেয়ে ফকির হয়ে জন্মানো ভালো। কারন ফকিরদের অভিনয় করতে হয়না আর মধ্যবিত্তদের প্রতিনিয়ত সুখে থাকার অভিনয় করতে হয়। মধ্যবিত্তরা না পারেন উপরে উঠতে না পারেন নিচে নামতে।’ সাম্প্রতিক সময়ে কথাটা যেন প্রত্যেক মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সত্য হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশে চলছে সরকারের দেয়া লকডাউন, সাধারণ ছুটি ঘোষনা করা হয়েছে আবার এছুটি আরো বাড়বে এমনটা ভাবাই স্বাভাবিক । দিন যত যাচ্ছে করোনা পরিস্থিতি ততই ভয়াবহ আকার ধারন করছে। বাংলাদেশে তুলনামূলক ভাবে করোনার চিত্র কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও যেকোন সময় মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে নিত্যপণ্য, ঔষধের দোকান ও গার্মেন্টস ছাড়া সকল দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও গণপরিবহন বন্ধ। মানুষ ঘরে বন্দি থাকার কারণে চরম বিপাকে পড়েছে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। একদিকে করোনা আক্রান্তের ভয় অপরদিকে কর্মহীন থাকার কারণে না খেয়ে মরার ভয় দু’য়ে মিলে উভয় সংকটে আছে মানুষ। উচ্চবিত্তদের কোন অসুবিধা না হলেও নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা পড়েছে বিপাকে। দোটানা হতাশার মধ্যে দিন কাটছে তাদের। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার দুঃচিন্তা অন্যদিকে পেটের ক্ষুধা ও পরিবারের অন্য চাহিদা পূরন করতে হবে, সেই ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।

হতদরিদ্র, শ্রমিক ও নিমআয়ের মানুষেরা কমবেশি সরকারি সহায়তা পাচ্ছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সেচ্ছাসেবী সংগঠন হতদরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের পাশে সহায়তা নিয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে চরম অসুবিধার মধ্য থাকলেও মধ্যবিত্তরা কাউকে কিছু বলতে পারছে না। একজন বেসরকারি শিক্ষক, একজন গনমাধ্যমকর্মী, একজন শিল্পী, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এছাড়া আরো এমন অনেক শ্রেণি-পেশার মানুষ আছে যাদের অনেকের ঘরে খাবার নেই, গচ্ছিত টাকা নেই, কারো কাছে থাকলেও তা ইতিমধ্যে প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছে। যারা ভাড়া বাড়িতে থাকেন তাঁদের অনেকেই বাসা ভাড়া দিতে পারছেন না। সঞ্চিত খাবারও শেষ হয়ে গেছে। এসব মানুষের দিন কাটছে অর্ধাহারে-অনাহারে মুখফুটে কিছু বলতে পারছে না

অভাব অনটনের তাড়নায় ঋণের বোঝা বাড়ছে। এই পর্যায়ে এসে তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এতে করে মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের লোকজন অভাব অনটনের কথা বলতে না পারছে কারো কাছে , না পারছে সইতে, না পারছে কোন সহায়তা নিতে। আবার শুরু হয়েছে রমজান মাস, তারপর ঈদ, সে পর্যন্ত মধ্যবিত্তরা পার করবে কিভাবে, আর সে অপেক্ষাই বা কতদূর। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সে কান্না ক্রমশ বাড়ছে। মার্কেটসহ সব প্রতিষ্ঠান যখন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে তখন সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত ব্যক্তিরা। কারণ মধ্যবিত্ত হওয়ার ফলে সহসাই তাঁরা সরকারি ও ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা পাচ্ছে না। অনেক স্থানে বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিরা মধ্যবিত্তদের সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে কিন্তু তাতে কয়জন মানুষ সে সাহায্যের জন্য হাত বাড়াবে, কয়জন মানুষই বা পাবে সে সাহায্য। অন্যদিকে চক্ষু লজ্জার কারণে এসব ব্যক্তিরা অভাব অনটনের কথা বলতে পারছে না। যে কারণে চরম দৈন্যদশার মধ্যে মধ্যবিত্ত পরিবারের বোবা কান্না যেন থামছে না। যার ফলে লকডাউনের ছুটির দিন যত গড়াচ্ছে মধ্যবিত্তদের বোবা কান্না তত বাড়ছে।

লেখক- ড. মুহম্মদ কামরুজ্জামান
ডীন, ব‍্যবসায় প্রশাসন অনুষদ
টাইমস ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ফরিদপুর

শিক্ষা উপদেষ্টা, ক‍্যাব, ফরিদপুর জেলা শাখা
ভাইস প্রেসিডেন্ট, ইউনেস্কো ক্লাব, ফরিদপুর।